May 29, 2017 সূত্রঃ anandabazar, khaboronline, hindustantimes
২০১৭ সালের ২ মে রাতে বারাসতের হৃদয়পুরে নিজের বাড়িতেই খুন হন একটি বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় সংস্থায় কর্মরত অনুপম সিংহ। পরের দিন দেহ উদ্ধার করে তদন্তে নামে পুলিশ। খুনের ১৩ দিনের মাথায় প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে বারাসত থেকে মনুয়া মজুমদার (সিংহ) এবং তার প্রেমিক অজিতকে গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, অজিতের সঙ্গে মনুয়ার বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের জেরেই অনুপমকে নৃশংস ভাবে খুন করে অজিত।

গত ২০১৭ সালের ২ মে প্রেমিক অজিতের সঙ্গে পরিকল্পনা করে স্বামী অনুপম সিংহকে ছক কষে খুন করে স্ত্রী মনুয়া। প্রেমিক অজিতকে নিজেদের ফাঁকা ফ্ল্যাটে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে চলে যায় মনুয়া। আগাম পরিকল্পনামাফিক প্রেমিক অজিতকে দিয়ে স্বামীকে খুন, ফোনের ওপার থেকে স্বামীর আর্ত চিৎকার স্ত্রী মনুয়ার ‘লাইভ’ শোনা, সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়।
গত ৩ মে, ২০১৭ হৃদয়পুরের সিংহ ভিলার ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় অনুপমের দেহ।পুলিশি তদন্তে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে উঠে আসে মনুয়া ও তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক অজিতের নাম। গ্রেফতার করা হয় দু’ জনকেই। জানা যায়, ছাত্রজীবনে অজিতের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল মনুয়ার। তবে অনুপমের সঙ্গেও মনুয়ার বিয়ে হওয়ার আগে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু বছর দেড়েক ঘুরতে না ঘুরতেই দাম্পত্য জীবনে নেমে আসে ওই নৃশংসতা!
খুনের পর থেকেই মিলছিল না অনুপম সিংহের তিনটি মোবাইল। যার মধ্যে একটি দিয়েছিল তাঁর স্ত্রী মনুয়া মজুমদার। মনুয়াকে জেরা করে একটি ফোনেরও হদিস মিলছিল না। অবশেষে ওই মহিলার প্রেমিক অজিত রায়কে জিজ্ঞাসাবাদ করে অনুপমের একটি ফোন উদ্ধার করছে পুলিশ। খুনের আগে মনুয়া ও অনুপমের মধ্যে কখন ও কতক্ষণ কথা হয়েছিল, ওই মোবাইল থেকে জানা গিয়েছে তা-ও। অনুপমের সেই ফোনের ইনবক্স ঘেঁটেও বেশ কিছু তথ্য উদ্ধার করেছে পুলিশ।
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, বাংলাদেশের বাসিন্দা, সরল স্বভাবের স্বামী অনুপমকে একেবারেই পছন্দ ছিল না মনুয়ার। বাংলাদেশ থেকে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন প্রায়ই অনুপমের বাড়িতে আসত।
তাঁদের আদর-আপ্যায়ন করতে বিরক্তও হতো মনুয়া।
শুধু তা-ই নয়, বিয়ের আগে তাদের পরিবারে মদ্যপানের রেওয়াজ ছিল বলে জানিয়েছে মনুয়া। বন্ধুদের আড্ডাতেও মাঝেমধ্যে মদ্যপান করত সে। অন্য দিকে, অনুপম ও তাঁর পরিবার ছিল এ সবের থেকে দূরে।
তদন্তে উঠে আসে, অনুপমের মাথায় ভারী অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে খুন করা হয়েছিল। খুনের দিন তাঁর স্ত্রী মনুয়া বাপেরবাড়িতে থাকলেও ঘটনার সময় প্রেমিক অজিতের মোবাইলে ফোন করে অনুপমের আর্তনাদ শুনেছিল। তদন্তকারীরা এ-ও জানতে পারেন, খুনের ঘটনার দিন অর্থাৎ ২ মে দুপুরে ওই বাড়িতে গিয়েছিল মনুয়া ও তার প্রেমিক অজিত। পরে মনুয়া বাপেরবাড়ি ফিরে গেলেও অজিত ওই বাড়িতেই লুকিয়ে ছিল। অনুপম আসতেই তাকে আক্রমণ করে অজিত। লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে মাথা থেঁতলে খুন করা হয় অনুপমকে।
তদন্তের জাল গুটিয়ে হত্যা-কাণ্ডের ৮৬ দিন পরে চার্জশিট জমা দেয় বারাসাত থানার পুলিশ।ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ফরেনসিক রিপোর্ট, ফোনের কল ডিটেলস-সহ যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ চার্জশিটের সঙ্গে দেওয়া হয়। আনা হয় ৩০২ ধারায় খুন, ১২০বি ধারায় ষড়যন্ত্র, ২০১ ধারায় প্রমাণ লোপাটের মতো ধারা। পুরো মামলায় মোট ৩১ জন সাক্ষী দেন। ৪৭৮ পাতার চার্জশিটের সঙ্গে যুক্ত হয় অতিরিক্ত চার্জশিটও। সব মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার থেকে দু’হাজার পাতার নথিপত্র পরীক্ষা, সাক্ষীদের বয়ান, সরকারি ও অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ সওয়াল-জবাবের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার মনুয়া ও অজিতকে দোষী সাব্যস্ত করেন বিচারক বৈষ্ণব সরকার।
অনুপমের পরিবার ও বন্ধুরা বারবারই দু’জনের ফাঁসির শাস্তি দাবি করেছেন। এ দিনও বারাসত আদালতে ছিলেন তাঁরা। বিচারক দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ফের মৃত্যুদণ্ডের সাজাই চেয়েছেন তাঁরা।

No comments:
Post a Comment